জামদানির ইতিহাস: দুই হাজার বছরের সুতো, পাঁচশো বছরের নাম
"জামদানি কত বছরের পুরনো?" — দোকানে এই প্রশ্নটা প্রায়ই আসে, আর ইন্টারনেটে উত্তর মেলে দুই হাজার থেকে পাঁচশো বছর পর্যন্ত যা খুশি। সত্যিটা একটু বড়, আর অনেক বেশি সুন্দর। এই লেখায় আমরা সূত্র ধরে ধরে বলছি: বাংলার সূক্ষ্ম কাপড় কোথা থেকে এল, "জামদানি" নামটা কবে হলো, কেন মসলিন হারিয়ে গেল কিন্তু জামদানি বেঁচে রইল, আর আজ রূপগঞ্জের তাঁতে কী হচ্ছে।
ছোট উত্তর: তিন স্তরে
- বাংলার মিহি সুতি কাপড়: দুই হাজার বছরের বেশি পুরনো। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গ আর পুণ্ড্রের চার রকম সূক্ষ্ম কাপড়ের নাম আছে; খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের গ্রিক নাবিকদের বই পেরিপ্লাসে "গাঙ্গেয় সুতি কাপড়"।
- "জামদানি" নামে নকশা-তোলা মসলিন: প্রায় পাঁচশো বছর। মুঘল দরবারের ফার্সি ভাষা থেকে নামটা এসেছে, সম্রাট আকবর বা জাহাঙ্গীরের সময়ে।
- আজকের তাঁতিদের ধারা: মুঘল যুগ থেকে একটানা, কখনো থামেনি।
তাই আমরা বলি: মুঘল দরবার থেকে আজ, প্রায় পাঁচশো বছরের জীবিত ঐতিহ্য; আর তার পেছনে বাংলার দুই হাজার বছরের সূক্ষ্ম বুননের উত্তরাধিকার।
যাঁরা বাংলার কাপড় দেখে অবাক হয়েছিলেন
সপ্তম শতকে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং বাংলার কাপড়কে তুলনা করেছিলেন ভোরের কুয়াশার সাথে। নবম শতকে আরব ভূগোলবিদ সুলাইমান লিখলেন, এ দেশের সুতি কাপড় এত মিহি যে আংটির ভেতর দিয়ে গলে যায়। চৌদ্দ শতকে ইবনে বতুতা সোনারগাঁর কাপড়ের প্রশংসা করলেন, আর ষোড়শ শতকের শেষে ইংরেজ পর্যটক র্যালফ ফিচ ও আকবরের ইতিহাসবিদ আবুল ফজল, দু'জনেই সোনারগাঁর মসলিনের কথা লিখলেন। সোনারগাঁ তখন "সোনার বন্দর", চীন থেকে ভারতে ঢোকার পথ।
মুঘল দরবার: স্বর্ণকাল
১৬১০ সালে ঢাকা মুঘল বাংলার রাজধানী হওয়ার পর ঢাকার কাপড় দূরের বাজারে পৌঁছাল। ধর্মীয় কারণে রেশম পরা নিরুৎসাহিত ছিল, তাই মুঘল সম্রাটরা মসলিনকে বিলাসের বিকল্প করে তুললেন। আইন-ই-আকবরীতে মসলিনের নামগুলো শুনলেই বোঝা যায় কাপড়টা কেমন ছিল: আব-ই-রওয়ান, মানে বহতা জল; শবনম, মানে সন্ধ্যার শিশির; মলমল খাস, যা শুধু রাজপরিবারের জন্য বোনা হতো।
এই সাদা মসলিনে হাতে ফুল তোলা শুরু হলো, আর সেই কাপড়ের নাম হলো জামদানি। নামের মানে নিয়ে তিন মত: ফার্সি "জাম" (ফুল) আর "দানি" (পাত্র) মিলে ফুলদানি; অথবা "জামা" (কাপড়) আর "দানা" (বুটি) মিলে বুটিদার কাপড়। কোনটা ঠিক, কেউ নিশ্চিত নয়। মুঘলের আগে কাপড়টার নাম ছিল স্রেফ "ঢাকাই", পশ্চিমবঙ্গে আজও তাই বলে।
দরবারের চাহিদা কত ছিল? ঢাকা, সোনারগাঁ আর জঙ্গলবাড়ি থেকে বছরে প্রায় এক লাখ টাকার মলমল খাস দিল্লিতে যেত। ১৭৪৭ সালে সম্রাট, বাংলার নবাব আর জগৎশেঠ মিলে কিনেছিলেন সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার মসলিন, ইউরোপীয় বণিকরা সাড়ে নয় লাখ টাকার। সম্রাট আওরঙ্গজেব এক পিস জামদানির দাম বেঁধে দিয়েছিলেন আড়াইশো টাকা। দরবারের অর্ডারে তাঁতিকে অগ্রিম দেওয়া হতো, একজন দারোগা প্রতিটা ধাপ দেখতেন। অগ্রিম নিয়ে মাপমতো বানানোর চল তিনশো বছর আগেও ছিল।
কোম্পানির আমল: মসলিন মরল, জামদানি বাঁচল
১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি পেল। এরপর গোমস্তারা তাঁতিদের চুক্তিতে বেঁধে ফেলল, তাঁতের ওপর কর বসল, ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষ কারিগর সমাজ ভেঙে দিল। ইংল্যান্ডে রপ্তানি ১৭৮৭ সালে ছিল ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ লাখ টাকা, ১৮০৭-এ সাড়ে আট লাখ, ১৮১৭-তে শূন্য। ১৮৩০-এর দশক থেকে ল্যাঙ্কাশায়ারের মেশিনে বোনা সস্তা কাপড় বাংলার বাজার দখল করল।
একটা গল্প সবাই শুনেছেন: ব্রিটিশরা নাকি তাঁতিদের বুড়ো আঙুল কেটে দিয়েছিল। ইতিহাসবিদরা এটাকে মিথ বলেন। গল্পটার উৎস ১৭৭২ সালের একটা রিপোর্ট, যেখানে লেখা রেশম-সুতা কাটুনিরা জবরদস্তি থেকে বাঁচতে নিজেরাই আঙুল কেটেছিল। নিপীড়ন সত্যি, আঙুল কাটার গল্পটা না।
মসলিন সত্যিই হারিয়ে গেল। যে ফুটি কার্পাস তুলা মেঘনার চরে জন্মাত, সেটাও উনিশ শতকের মাঝামাঝি বিলুপ্ত। কিন্তু জামদানি থামেনি। ১৮৫১ সালের লন্ডন মহাপ্রদর্শনীতে "ঢাকা জামদানি" স্কার্ফ গেল, ১৮৬২-র লন্ডন আর ১৮৬৫-র ডাবলিন প্রদর্শনীতেও। ১৮৪০ সালে জেমস টেলর ঢাকায় সতেরোশো তাঁতি পরিবার গুনেছিলেন। মসলিন যখন স্মৃতি, জামদানি তখনো তাঁতে।
রূপগঞ্জ আর সোনারগাঁ: আজকের জামদানি
১৯৪৭ সালে শুধু তারাবো ইউনিয়নেই প্রায় সতেরো হাজার তাঁত ছিল, প্রায় প্রতি ঘরে একটা। দেশভাগ, যুদ্ধ আর সস্তা কাপড়ের ধাক্কায় ১৯৯৩ সালে পনেরোটা গ্রামে তাঁতি নেমে আসে মাত্র এগারোশোর কাছে। সেই বছরই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে, নোয়াপাড়া গ্রামে জামদানি শিল্পনগরী তৈরি শুরু হয়, যা সবাই চেনে জামদানি পল্লি নামে। ২০০২ সালে কারিগর দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ হাজার সাতশো।
আজ পল্লিতে চারশোর বেশি তাঁতি পরিবার, ষোলোশোর বেশি তাঁত, আর প্রতি শুক্রবার ফজরের নামাজের পর বসে জামদানি হাট। ভোরের আলোয় শত শত তাঁতি আর পাইকার, হাতে হাতে শাড়ি। কাঁচপুর সেতু থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে, শীতলক্ষ্যার পাড়ে।
কেন ঢাকাতেই? মেঘনা আর শীতলক্ষ্যার পাড়ের মাটিতে সেরা তুলা হতো, নদীর জলে ধোয়া কাপড়ে আলাদা জেল্লা আসে, আর এখানকার বাতাসের আর্দ্রতা ছাড়া মিহি সুতা ছিঁড়ে যায়। ১৭৯০ সালে ব্রিটিশরা অন্য জায়গায় এই তুলা ফলাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। যে তাঁতিরা অন্য জেলায় গিয়ে বুনতে চেষ্টা করেছেন, তাঁরা ফিরে এসেছেন।
তাঁতে কী হয়: কেন একটা শাড়িতে মাস লাগে
জামদানির নকশা কাপড়ে ছাপা নয়, এমব্রয়ডারিও নয়। বোনার সময় মূল সুতার পাশাপাশি প্রতিটা বুটির জন্য আলাদা মোটা সুতা বাঁশের কাঠি দিয়ে হাতে টানায় ঢোকানো হয়। সেজন্য আসল জামদানিতে উল্টো পিঠেও নকশা দেখা যায়, ছাপা কাপড়ের উল্টো পিঠ সাদা।
তাঁতে দু'জন বসেন। ওস্তাদ নকশা মুখে বলে যান, শাগরেদ অনুসরণ করেন। নকশা কাগজে আঁকা থাকে না, মুখস্থ; শেখা শুরু হয় দশ-বারো বছর বয়সে, নিজের পরিবারে। সুতা রঙ করে ভাতের মাড়ে ভিজিয়ে শুকানো হয়, আর নলিতে জড়ানো হয় ভোর চারটা থেকে নয়টার মধ্যে, যখন বাতাসে আর্দ্রতা সবচেয়ে বেশি। সুতা যত মিহি, তত বেশি সময়: সাধারণ শাড়িতে এক-দুই মাস, ভারী কাজে পাঁচ মাসের বেশি।
১৯০০ সাল পর্যন্ত জামদানি ছিল সাদা জমিনে সাদা নকশা। রঙিন জমিন আর রেশমি সুতা এল বিংশ শতকের গোড়ায়, লাল জমিন জনপ্রিয় হলো ১৯৬০-এর দশকে।
নকশার নাম: বাংলার মাটি থেকে
জামদানির ষাটের বেশি নকশার নাম আছে, আর সবগুলো তাঁতির চারপাশের বাংলা থেকে নেওয়া। পান্না হাজার মানে হাজার পান্না, জমিন জুড়ে ছোট ফুলের ঝিলিক। তেরছা, কোনাকুনি সারিতে ফুল। জাল, পুরো জমিনে জালের মতো নকশা, সবচেয়ে কঠিন। কলকা পাড়, ময়ূরপ্যাঁচ, কলমিলতা, পুঁইলতা, কচুপাতা, শাপলা ফুল, জবাফুল, সন্দেশ পাড়, চন্দ্রহার, ঝুমকা, বাদুড়পাখি পাড়। আমাদের শাড়ি আর পাঞ্জাবির কারুকাজে এই নামগুলোই ফেরে। আসল জামদানি চেনার ৭টি সহজ উপায় লেখায় উল্টো পিঠ দেখে চেনার কথা বলেছি; নকশার নাম জানলে চেনা আরও সহজ।
স্বীকৃতি
২০১৩ সালের ডিসেম্বরে বাকুতে ইউনেস্কো জামদানি বুননকে মানবতার অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় তোলে, বাংলাদেশের ঐতিহ্য হিসেবে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে জামদানি শাড়ি হয় বাংলাদেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) পণ্য। ২০১৯ সালে ওয়ার্ল্ড ক্রাফটস কাউন্সিল সোনারগাঁকে জামদানির জন্য "ওয়ার্ল্ড ক্রাফট সিটি" ঘোষণা করে, বাংলাদেশে প্রথম।
প্রায়ই যে প্রশ্নগুলো আসে
জামদানি কত বছরের পুরনো?
"জামদানি" নামটা মুঘল আমলের, প্রায় পাঁচশো বছর। তার পেছনে বাংলার মিহি সুতি কাপড়ের দুই হাজার বছরের ইতিহাস, যার প্রথম লিখিত উল্লেখ খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের অর্থশাস্ত্রে।
জামদানি কোথায় তৈরি হয়?
ঢাকার পাশে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ (তারাবো, নোয়াপাড়া, রূপসী), সোনারগাঁ আর সিদ্ধিরগঞ্জের গ্রামে, শীতলক্ষ্যার পাড়ে। রূপগঞ্জের জামদানি পল্লিতে প্রতি শুক্রবার ভোরে হাট বসে।
জামদানি শব্দের অর্থ কী?
ফার্সি শব্দ। সবচেয়ে প্রচলিত মত: "জাম" মানে ফুল, "দানি" মানে পাত্র, অর্থাৎ ফুলদানি। বাংলাপিডিয়ার মত: "জামা" মানে কাপড়, "দানা" মানে বুটি। কোনটা ঠিক, নিশ্চিত করে কেউ জানে না।
জামদানি আর মসলিন কি একই?
না। মসলিন প্রায় নকশাহীন, ৩০০ কাউন্টের বেশি সুতার অতি-মিহি কাপড়, যা উনিশ শতকে হারিয়ে যায়। জামদানি সেই ধারার কাপড়ে হাতে তোলা নকশা, সাধারণত ৪০ থেকে ১২০ কাউন্ট, আর এটা কখনো বন্ধ হয়নি।
আসল জামদানি চিনব কীভাবে?
শাড়ি বা পাঞ্জাবি উল্টে দেখুন। হাতে বোনা জামদানিতে নকশা দুই পিঠেই দেখা যায়; ছাপা বা মেশিনের কাপড়ের উল্টো পিঠ সাদা। বাকি উপায় এই লেখায়।
নকশী কুঠিরে এই ইতিহাস কোথায়
আমাদের প্রতিটা পাঞ্জাবি আর শাড়ির নকশা সেই একই কৌশলে, হাতে তোলা; তাই উল্টে দেখলে নকশা পাবেন। প্রিমিয়াম পাঞ্জাবি আজও মুঘল দরবারের মতো অগ্রিম নিয়ে আপনার মাপে কাটা হয়। আর শাড়ির কাউন্ট, সুতা ও কাজের নাম প্রতিটা প্রোডাক্ট পেজে লেখা থাকে, যাতে আপনি জানেন কী কিনছেন।
জামদানি শাড়ির দাম কীভাবে ঠিক হয়
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স — তাঁতি (চার্লস ডি'অয়লি, ১৮২৭, পাবলিক ডোমেইন), রেনাল্ডির চিত্র (১৭৮৯, পাবলিক ডোমেইন), সোনারগাঁর কুঠি (ডব্লিউ. ব্রেনান্ড, ১৮৭২, পাবলিক ডোমেইন), তাঁতে বুনন (Joysaha.bd, CC BY-SA 4.0), লাল জামদানি (Kritzolina, CC BY-SA 4.0)।
হাতে বোনা Original Jamdani design, সারা বাংলাদেশে ডেলিভারি।
কালেকশন দেখুন








