জামদানির নকশার নাম: পান্না হাজার থেকে ময়ূরপ্যাঁচ, কোনটা কী
তাঁতির মুখে শুনবেন: "এটা তেরছা", "ওটা পান্না হাজার", "পাড়টা কলকা"। জামদানির ষাটের বেশি নকশার নাম আছে, আর একটাও বইয়ে লেখা নেই; ওস্তাদ থেকে শাগরেদের মুখে মুখে চলে এসেছে। নামগুলো জানলে দুটো লাভ: শাড়ি বা পাঞ্জাবি দেখে বলতে পারবেন কী কাজ, আর দোকানে ঠিক নকশাটা চাইতে পারবেন। এই লেখায় নামগুলো দলে দলে সাজিয়ে দিলাম, সাথে আমাদের নিজের কালেকশনের ছবি, যাতে নাম আর নকশা মিলিয়ে নিতে পারেন।
আগে তিনটা গঠন বুঝুন
নকশার নাম যত হোক, জমিনের কাজ মূলত তিন রকম। বাকি সব নাম এই তিনটার ভেতরেই পড়ে।
- বুটি: জমিনে ছড়ানো ছোট ছোট নকশা, মাঝে ফাঁকা। সবচেয়ে কম সময় লাগে, দামও তুলনায় কম।
- তেরছা: বুটি বা ফুল কোনাকুনি সারিতে সাজানো, যেন বৃষ্টি পড়ছে। চোখে শাড়িকে লম্বা দেখায়।
- জাল: পুরো জমিন জুড়ে জালের মতো একটানা নকশা, কোথাও ফাঁকা নেই। সবচেয়ে বেশি সময়, সবচেয়ে দামি। তাঁতিরা একে "অল ওভার"ও বলেন।
জমিনের বুটি: যে নামগুলো সবচেয়ে বেশি শুনবেন
- পান্না হাজার: মানে হাজার পান্না। জমিন জুড়ে অজস্র ছোট ঝিলিক, দূর থেকে কাপড়টা চিকচিক করে। ঐতিহ্যে বুটিগুলো সবুজ সুতায়, তাই পান্না।
- বুটিদার: ছড়ানো ছোট ফুল। জামদানির সবচেয়ে পুরনো ও সরল রূপ; রোজকার শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে এটাই বেশি।
- দুরিয়া: সারা জমিনে ছোট ফোঁটা, ফুল নয়।
- জুঁইবুটি, শামুকবুটি: বুটির আকার জুঁই ফুলের বা শামুকের মতো হলে এই নাম।
- হীরা বুটি, তারা বুটি, চারকোনা: জ্যামিতিক বুটি, হীরার মতো রম্বস, তারা বা চৌকো।
- আশরফি: মোহরের মতো গোল বুটি (পুরনো তালিকায় আছে, এখন কম দেখা যায়)।
লতা আর পাতা: বাংলার আঙিনা থেকে
তাঁতির ঘরের পাশে যা জন্মায়, নকশায় তাই উঠে এসেছে।
- কলমিলতা: কলমি শাকের লতার মতো ঢেউ খেলানো সারি, মাঝে মাঝে পাতা।
- পুঁইলতা: পুঁই লতা, একটু গোল পাতা, উপরে ওঠা ভঙ্গি।
- আঙুরলতা: আঙুরের থোকা আর লতা, পাড়ে বা আঁচলে।
- কচুপাতা: কচুর বড় পানপাতা-আকৃতির পাতা, সাধারণত পাড়ে।
- বেলপাতা পাড়, শালপাড়: বেল বা শাল পাতার সারি দিয়ে পাড়।
- দূর্বা পাড়: দূর্বা ঘাসের মতো সরু সরু কাজের পাড়।
- মাধবীলতা: ফুলসহ লতা, লম্বা টানা নকশা।
ফুল
- শাপলা ফুল: জাতীয় ফুল, পাড়ে বা জমিনে, পাপড়ি ছড়ানো।
- জবাফুল, জুঁই, কলসফুল: আকার দেখে নাম।
- গোলাপ, পদ্ম: এগুলো তুলনায় নতুন, বিংশ শতকে এসেছে।
- ফুলওয়ার: সারি সারি ফুল, সাধারণত পাড় ঘেঁষে।
- তোড়াদার: পাড়ে বড় ফুলের তোড়া।
পাখি, প্রাণী আর পোকা
- ময়ূরপ্যাঁচ, ময়ূরপাখা: ময়ূরের লেজের পালকের প্যাঁচানো ভঙ্গি, জামদানির সবচেয়ে চেনা পাড়ের একটা। চুড়ির ভেতর ময়ূর থাকলে "বঙ্গদী মোর"।
- হংসবলাকা: উড়ন্ত হাঁসের সারি, আঁচলে।
- প্রজাপতি পাড়: প্রজাপতির ডানার মতো জোড়া মোটিফ।
- বাদুড়পাখি পাড়: ডানা মেলা বাদুড়ের মতো ত্রিভুজ-জোড়া।
- বাঘনলি: বাঘের নখের মতো বাঁকা মোটিফ।
- কাঁকড়া, পোনা মাছ, শঙ্খ, সাপ: পুরনো তালিকায় আছে; নদীপাড়ের গ্রামের নকশা।
পাড়ের নাম
পাড়ের নকশার আলাদা নাম আছে, কারণ পাড়ই প্রথম চোখে পড়ে।
- কলকা পাড়: কলকা, মানে আমের মতো বাঁকা ফোঁটা (ইংরেজিতে পেইজলি)। মুঘল আমল থেকে চলে আসা সবচেয়ে বিখ্যাত পাড়।
- সন্দেশ পাড়: সন্দেশের ছাঁচের মতো অর্ধগোল সারি।
- চন্দ্রপাড়: চাঁদের মতো অর্ধচন্দ্র সারি।
- ইঞ্চিপাড়: এক ইঞ্চি চওড়া সরু পাড়, সাধারণ।
- বেলওয়ারি: রঙিন সোনালি পাড়; মুঘল আমলে হারেমের নারীদের জন্য বোনা হতো।
- জলপাড়, ঝালর: ঢেউ বা ঝালরের মতো নিচের দিকে নামা পাড়।
- জরিপাড়, তিরপাড়: জরির সুতার পাড়; তিনটে সমান্তরাল রেখার পাড়।
গয়না আর মিষ্টির নামে
- চন্দ্রহার: চাঁদের মালার মতো সারি, গলার হারের নামে।
- ঝুমকা: ঝুলন্ত দুলের মতো মোটিফ।
- সাবুদানা, মটরদানা: খুব ছোট গোল বুটি, দানার মতো।
- জিলাপি প্যাঁচ: জিলাপির মতো প্যাঁচানো রেখা।
- করলা: করলার গায়ের দানাদার ভঙ্গি, পাড়ে।
আধুনিক নাম
তাঁতিরা থেমে থাকেননি। গত কয়েক দশকে এসেছে গোলাপ, জুঁই, পদ্ম, কলার কাঁদি, আদার কাঁদি, সাবুদানা। আর বড় দোকান আর ডিজাইনাররা নিজেদের শাড়িকে নিজেদের মতো নাম দেন। আমরাও দিই: "রঙ্গন মেলা", "মাছরাঙার পালক", "পান্না কুয়াশা"। তবে ওগুলো শাড়ির নাম, নকশার নাম নয়; নকশার নাম সেই পুরনোগুলোই, যেগুলো তাঁতি বলেন।
কেনার সময় নামগুলো কীভাবে কাজে লাগে
- দাম বোঝা: জাল সবচেয়ে বেশি সময়ের কাজ, তারপর তেরছা, তারপর বুটি। একই সুতায় জাল-এর শাড়ির দাম বুটিদারের দেড় থেকে দুই গুণ হওয়া স্বাভাবিক। দামের পুরো হিসাব জামদানি শাড়ির দাম লেখায়।
- ছবি দেখে চেনা: পাড়ে প্যাঁচানো পালক মানে ময়ূরপ্যাঁচ, আমের মতো ফোঁটা মানে কলকা, কোনাকুনি সারি মানে তেরছা। এটুকু জানলে অনলাইনে অর্ডার দেওয়া সহজ।
- আসল চেনা: হাতে বোনা জামদানিতে একই নকশার দুটো বুটি হুবহু এক হয় না, আর উল্টো পিঠে নকশা দেখা যায়। বাকি উপায় আসল জামদানি চেনার ৭টি সহজ উপায় লেখায়।
- পাঞ্জাবিতেও একই নাম: আমাদের পাঞ্জাবির "গোল্ডেন কারুকাজ" বা "ক্রিম কারুকাজ" আসলে বুটিদার বা তেরছা কাজ; প্রোডাক্ট পেজের ছবি জুম করলে দেখবেন।
প্রায়ই যে প্রশ্ন আসে
জামদানির সবচেয়ে বিখ্যাত নকশা কোনটা?
পাড়ে কলকা আর ময়ূরপ্যাঁচ, জমিনে পান্না হাজার আর তেরছা। এই চারটা নাম জানলে বেশিরভাগ জামদানি চিনে ফেলবেন।
নকশা কি কাগজে আঁকা থাকে?
ঐতিহ্যবাহী ধারায় না। ওস্তাদ নকশা মুখে বলেন, শাগরেদ বোনেন, সব মুখস্থ। নতুন নকশায় কেউ কেউ টানার নিচে গ্রাফ কাগজ রাখেন।
একই নকশা কি দুই শাড়িতে হুবহু এক হয়?
না। প্রতিটা বুটি হাতে তোলা, তাই এক নকশার দুটো শাড়িও একটু আলাদা। এটাই হাতে বোনার প্রমাণ।
নামগুলো চোখে দেখতে
হাতে বোনা Original Jamdani design, সারা বাংলাদেশে ডেলিভারি।
কালেকশন দেখুন




