জামদানি কোথায় তৈরি হয়: রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ আর শুক্রবার ভোরের হাট
"জামদানি কোথায় তৈরি হয়?" উত্তরটা এক শব্দে: ঢাকার পাশে, শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে। একটু খুলে বললে: নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো, নোয়াপাড়া, রূপসী, কাজীপাড়ার মতো কয়েকটা গ্রাম, সোনারগাঁ আর সিদ্ধিরগঞ্জ। পৃথিবীর আর কোথাও এই কৌশলে এই কাপড় এভাবে বোনা হয় না, আর কেন হয় না তার কারণটাও নদীর পাড়েই লুকিয়ে। এই লেখায় জায়গাগুলো চিনিয়ে দিচ্ছি, সাথে শুক্রবার ভোরের হাটে কীভাবে যাবেন।
এক নজরে: জামদানির মানচিত্র
- রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ: তারাবো ইউনিয়নের নোয়াপাড়া, দক্ষিণ রূপসী, রূপসী কাজীপাড়া, গন্ধর্বপুর, মুগরাকুল, খিদিরপুর, খালপাড়া, পবনকুল, সুলতানবাগ। আজকের জামদানির প্রাণকেন্দ্র; এখানেই সরকারি জামদানি পল্লি।
- সোনারগাঁ: মুঘল আমলে বাংলার রাজধানী আর মসলিনের বন্দর; আজও তাঁতিপাড়া আছে, শাড়ি বিক্রির দোকানও। ২০১৯ সালে World Crafts Council সোনারগাঁকে জামদানির জন্য "ওয়ার্ল্ড ক্রাফট সিটি" ঘোষণা করে।
- সিদ্ধিরগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জ শহরের কাছে, শীতলক্ষ্যার পশ্চিম পাড়ের তাঁতিগ্রাম।
- ডেমরা, ঢাকা: বালু নদের পাড়ে দেশের সবচেয়ে পুরনো জামদানি হাট।
- একসময় ছিল, এখন নীরব: কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর ও জঙ্গলবাড়ি (মধুরাপুর গ্রাম ১০০ কাউন্টের সুতার জন্য বিখ্যাত ছিল), ঢাকার ধামরাই, ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে অল্প কিছু তাঁত।
রূপগঞ্জের জামদানি পল্লি
ঢাকা থেকে সিলেট মহাসড়ক ধরে কাঁচপুর সেতু পার হয়ে তিন কিলোমিটার উত্তরে নোয়াপাড়া। এখানে ১৯৯৩ সালে সরকার (BSCIC) জামদানি শিল্পনগরী ও গবেষণা কেন্দ্র তৈরি শুরু করে, শেষ হয় ১৯৯৯-এ। বিশ একর জমিতে চারশোর বেশি প্লট, প্রতিটায় একটা তাঁতি পরিবার আর তাদের তাঁত। স্থানীয়রা বলেন "জামদানি পল্লি" বা "BSCIC নগরী"।
সংখ্যাগুলো একটু পেছনে তাকালে বোঝা যায় কেন এই পল্লিটা জরুরি ছিল। ১৯৪৭ সালে শুধু তারাবো ইউনিয়নেই প্রায় সতেরো হাজার তাঁত ছিল; ১৯৯৩ সালে পনেরোটা গ্রামে তাঁতি নেমে আসে প্রায় এগারোশোতে। পল্লি হওয়ার পর ২০০২ সালে কারিগর দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ হাজার সাতশো। আজ পল্লিতে ষোলোশোর বেশি তাঁত চলে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ কাজ করেন।
পল্লির ভেতরে হাঁটলে প্রতিটা ঘর থেকে মাকুর শব্দ আসে। গর্ত-তাঁতে দু'জন বসে: ওস্তাদ নকশা মুখে বলেন, শাগরেদ বোনেন। নকশা কাগজে নেই, মুখস্থ। ছেলেমেয়েরা দশ-বারো বছর বয়স থেকে পাশে বসে শেখে।
শুক্রবার ভোরের হাট
জামদানির আসল বাজার দোকান নয়, হাট। সপ্তাহে একদিন, শুক্রবার, ফজরের নামাজের পরপর।
- নোয়াপাড়া হাট (জামদানি পল্লির পাশে): ভোর পাঁচটা থেকে আটটা-নয়টার মধ্যে শেষ। শত শত তাঁতি সারা সপ্তাহের বোনা শাড়ি কাঁধে নিয়ে আসেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম-খুলনার পাইকাররা কিনে নেন। BSCIC-এর জমি, ইজারা নেই। কোনো কোনো সপ্তাহে হাট এক ঘণ্টাতেই ফাঁকা।
- ডেমরা হাট: ডেমরা চৌরাস্তা থেকে উত্তরে লতিফ বাওয়ানী জুট মিল সড়ক ধরে ডেমরা বাজার, বালু নদের পাড়ে। শুক্রবার ভোর পাঁচটা থেকে সকাল নয়টা। এটা দেশের সবচেয়ে পুরনো জামদানি হাট; রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জের তাঁতিরা এখানেও আসেন।
- দাম: হাটে শাড়ি সাড়ে তিন হাজার থেকে শুরু, ভারী কাজে এক লাখ পর্যন্ত। দরদাম চলে, নগদ টাকা লাগে।
সোনারগাঁ: যেখান থেকে শুরু
মুঘল আমলের আগে থেকেই সোনারগাঁ ছিল "সোনার বন্দর", চীন থেকে ভারতে ঢোকার জলপথ। ইবনে বতুতা চৌদ্দ শতকে এখানকার সুতি কাপড়ের প্রশংসা করেছেন, র্যালফ ফিচ আর আবুল ফজল ষোড়শ শতকে। আজ সোনারগাঁ উপজেলার কয়েকটা গ্রামে এখনো জামদানি বোনা হয়, আর পানাম নগরের কাছে লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর ঘুরে তাঁতিপাড়া আর শাড়ির দোকান দুটোই দেখা যায়। ২০১৯ সালের জামদানি উৎসবের পর ওয়ার্ল্ড ক্রাফটস কাউন্সিল সোনারগাঁকে বাংলাদেশের প্রথম ওয়ার্ল্ড ক্রাফট সিটি ঘোষণা করে।
কেন ঢাকাতেই, আর কোথাও নয়
তাঁতিরা অন্য জেলায় গিয়ে বুনতে চেষ্টা করেছেন, ফিরে এসেছেন। কারণগুলো একটা-দুটো নয়:
- তুলা: মেঘনা আর শীতলক্ষ্যার পাড়ের লোহা-সিলিকা-চুনসমৃদ্ধ মাটিতে সেরা সুতি তুলা হতো; ফুটি কার্পাস নামের মসলিনের তুলা শুধু মেঘনার চরে জন্মাত। রাজেন্দ্রপুরের আজকের নাম কাপাসিয়া, কার্পাস থেকে। ১৭৯০ সালে ব্রিটিশরা অন্য জায়গায় এই তুলা ফলাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়।
- জল: শীতলক্ষ্যার জলে ধোয়া কাপড়ে আলাদা জেল্লা আসে। সোনারগাঁর বণিকরা আজও বলেন, অন্য নদীর জলে সেই চমক আসে না।
- বাতাস: মিহি সুতা শুকনো বাতাসে ছিঁড়ে যায়। এখানকার আর্দ্রতায় ভোর চারটা থেকে নয়টার মধ্যে নলি জড়ানো হয়; দুপুরের শুকনো হাওয়ায় কাজ বন্ধ।
- নদীপথ: কাপাসিয়া, রূপগঞ্জ, মুড়াপাড়া, নারায়ণগঞ্জের হাটে নদী দিয়ে তুলা আসত, কাপড় যেত ঢাকা হয়ে বিশ্ববাজারে।
- হাত: নকশা মুখস্থ, শেখা পরিবারে। কৌশলটা মানুষের সাথে বাঁধা, কারখানার সাথে নয়।
স্বীকৃতিও এই গ্রামগুলোর নামে
২০১৩ সালে ইউনেস্কো যে জামদানি বুননকে মানবতার অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় তোলে, তার নথিতে সম্প্রদায় হিসেবে লেখা আছে রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জের জামদানি শিল্পীদের নাম। ২০১৬ সালে জামদানি শাড়ি বাংলাদেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) পণ্য হয়; GI মানেই "এই জায়গার জিনিস"।
নকশী কুঠিরের জামদানি কোথা থেকে আসে
আমাদের শাড়ি, পাঞ্জাবি আর কটির কাপড় এই অঞ্চলের তাঁত থেকেই আসে; হাটে আর তাঁতিঘরে গিয়ে বাছাই করি। প্রতিটা প্রোডাক্ট পেজে কাপড়ের ধরন, কাউন্ট আর কাজের বর্ণনা লেখা থাকে, যাতে আপনি জানেন হাতে কী আসছে। সরাসরি হাটে যেতে না পারলে, কালেকশনটা দেখুন:
প্রায়ই যে প্রশ্ন আসে
জামদানি পল্লি কোথায়?
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো ইউনিয়নের নোয়াপাড়া গ্রামে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে কাঁচপুর সেতু পার হয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তরে, ঢাকা শহর থেকে ঘণ্টাখানেকের পথ।
জামদানি হাট কবে বসে?
শুক্রবার ভোরে। নোয়াপাড়ায় ফজরের পর থেকে আটটা-নয়টা, ডেমরা বাজারে ভোর পাঁচটা থেকে নয়টা। দেরি করলে ফাঁকা হাট পাবেন।
হাটে কি খুচরা কেনা যায়?
যায়। পাইকাররা বেশি, কিন্তু একটা শাড়িও তাঁতিরা বিক্রি করেন। নগদ টাকা নিন, দরদাম করুন, আর শাড়ি উল্টে দেখুন নকশা দুই পিঠে আছে কি না।
সোনারগাঁ না রূপগঞ্জ, কোথায় যাব?
তাঁত আর হাট দেখতে রূপগঞ্জ (শুক্রবার ভোরে)। ইতিহাস, জাদুঘর আর দোকান একসাথে চাইলে সোনারগাঁ, যেকোনো দিন।
জামদানির ইতিহাস: দুই হাজার বছরের সুতো, পাঁচশো বছরের নাম
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স — Wasiul Bahar (CC BY-SA 4.0), Syed Sajidul Islam (CC BY-SA 4.0), Armanaziz (CC BY-SA 3.0), Subornolota (CC BY-SA 3.0)।
হাতে বোনা Original Jamdani design, সারা বাংলাদেশে ডেলিভারি।
কালেকশন দেখুন




